advertisement

শিশিরের স্বপ্ন

শিশির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। সে দর্শন বিভাগের অনার্স শেষ বর্ষের ছাত্র। তার বাসা বংপুর জেলার আদি শহর মাহিগঞ্জের ডিমলা গ্রামে। শিক্ষা স্বংস্কৃতি, ইতিহাস ঐতিহ্যে ভরা সে গ্রাম। মাহিগঞ্জ বাজার হতে খাড়া দক্ষিনে যার অবস্থান। খুব কাছেই। রাস্তার দুই পাশে ইতিহাসের ঘনঘটা। কয়েক মিনিট হাটলেই মট আলা দিঘি। যেন দিঘির মাঝে স্বর্গ, উদ্যান। আর কিছু পথ এগুলেই ডিমলা মোড়। ডান পাশে কালি মন্দির সবুজে পল্ববে এক উপাষনালয়ের অন্য প্রকাশ। মাহিগঞ্জকে যে কয়েকজন জমিদার শাসন প্রিতী, অনুরাগে ঐতিহ্যের তাজ পড়িয়েছে। তার মাঝে ডিমলা জমিদার অন্যতম।এই গ্রামের প্রাইমারী শিক্ষক হাবিব রহমানের পুত্র হলো শিশির। সেই স্কুল থেকে শিশির প্রাইমারী পাশ করে। ইতিহাস ক্ষ্যাত আফান উল্লাহ উচ্চবিদ্যালয় থেকে এস,এস,সি (মেট্রিক) শেষ করে। খুব ভালো ফলাফল৷ তার আইয়ে পাশ করার ম্মৃতি মাহিগঞ্জ কালেজের ধুলো বালি,প্রতিটি শ্রেনিকক্ষ,প্রতিটি দরজা জনালার সাথে নিবির ভাবে মিশে আছে। স্কুলের কাজে কোন এক প্রয়োজনে ঢাকায় যাবার পথে সড়ক দূর্ঘটনায় শিশিরের বাবার মৃত্যু ঘটে। বাবার মৃত্যুতে শিশিরের জীবনে নেমে আসে এক নতুন মোড়। সে ভাবে সবকিছু ছেড়ে এবার পরিবারের দায়িত্ব নেবে। কিন্তু তার মায়ের স্বপ্ন ছিলো ছেলে পড়াশুনা শেষ করে বড় কিছু হবে। তাই শত কষ্টের মাঝেও শিশিরকে তিনি সংসারের ভার টানতে দিতে রাজি নন। শিশির অনেকটা দার্শনিক চিন্তমনা মানুষ ছিলেন। সৃষ্টিশীল তার চিন্তা। সারাক্ষন প্রকৃতির বিচিত্রসব বস্তু নিয়ে চিন্তা করতে তার খুবই ভালো লাগতো । মাঝে মাঝে তার প্রকৃতি প্রেম ফুটে উঠত তার লিখনিতে। তাদের আড্ডা জমে থাকতো হাসি, মজা,গান বাজনা আবার কখনো কখনো দেশের বাস্তবিক অবস্থার প্রেক্ষিতে। এমনকি এক অবসর মূর্হুত্বে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেবার সময় শিশিরের পরিচয় ঘটে বিশ্ব বিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী বিন্দুর সঙ্গে। তারা যখন সবাই মিলে গল্প গুজব করতো মেয়েটা তখন দুরে দাঁড়িয়ে শিশিরের দিকে তাকিয়ে থাকতো। কোন ভাবে একদিন বন্ধুদের মাধ্যমে তার সঙ্গে কথা হয় শিশিরের। ওরা দুজন দুজনকে আনেক পছন্দ করতো। তাদের মধ্যে অনেক কথাও চলত।শিশিরের স্বপ্ন ছিল পড়াশুনা শেষ করে সে অনেক বড় একটা চাকুরি করবে। মা বোনকে নিয়ে ছোট একটা সংসার হবে তার। আর সেই সংসারের মধ্যমনি হয়ে তারপাশে থাকবে বিন্দু। বিন্দুর হাত ধরে সে গ্রামের সবুজ মাঠে নদীর বাঁকে ঘুরে বেড়াবে। কিন্তু খুব বেশি দিন শিশিরের সে স্বপ্ন সবুজ প্রকৃতিতে মিশে থাকতে পারল না।১৯৭১ সাল, ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের পরিবেশ অনেকটা উত্তাল। পাকিস্তানিরা যেভাবে বাঙ্গালিদের উপর জুলুম নির্যাতন চালাচ্ছে তা আর মেনে নেওয়া যায়না। সাড়া দেশে মুক্তির আশায় প্রতীক্ষমান মানুষ। তারা সকলে বঙ্গ বন্ধুর ঘোষনার অপেক্ষায় প্রতীক্ষমান । ১৯৭১ সালের ৭মার্চ বঙ্গ বন্ধুর নেতৃত্বে ঢাকার রেসকোচ ময়দানে জনতার ভিড় জমল।বঙ্গ বন্ধুর মুক্তির আহবানে সাড়া দিল দেশের লাখো দেশ প্রেমিক মানুষ। তাঁরা বীরের বেশে ছড়িয়ে পড়ল মুক্তির খোঁজে। ২৬শে মার্চ রাতে যখন স্বৈরাচারী পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মধ্যরাতে নীরহ বাঙ্গালীদের মঞ্জিলা মমতাজ


উপর হামলা করলো, শত শত, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিল, মানুষ মারল, তখন শিশিরেরা আর বসে থাকতে পালো না। তখন যেন তার স্বপ্নের প্রকৃতি পাল্টে গেলো।তার চোখে এখন স্বপ্ন দেশ মাতৃকার মুক্তি। দেশ স্বাধীন হলেই সে তার স্বপ্ন পূরন করবে স্বাধীন দেশে, ঠিক তখনি শিশিরের মনে পড়ে গেল তার মায়ের কথা সে গ্রামে গিয়ে তার মায়ের কাছে দোয়া নিয়ে ছোট বোনটাকে বুকে জড়িয়ে আদর করল। পরিবারের সঙ্গে বসে রাতের খাবার খেলো আর অধির নয়নে মায়ের দিকে তাকাল সে হয়তো বুঝেই নিয়েছিল এটিই তার পরিবারের সঙ্গে তার শেষ অবস্থান। ভোর হতে না হতেই সে ঢাকায় রওনা দিল। কারন সে অনেক বড় একটা দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে। পরদিন সকালে ঢাকায় পৌঁছে সে বিন্দুর সঙ্গে দেখা করল। সবকিছু বলে সে বিন্দুর কাছ থেকে বিদায় নিল। বিন্দুও তাকে বাঁধা দিল না। কারন সেও একজন স্বাধীনতাকামী মানুষ। যদিও তার চোখে ঘর বাঁধার স্বপ্ন প্রতিক্ষমান, কিন্তু তা দেশ মাতৃমার মুক্তির চেয়ে বড় নয়। তাই সে খুব সহজেই শিশিরকে বিদায় দিলো। বিন্দু অনেক সাহসী মেয়ে ছিলো, তাই সে খুব একটা কাঁদল না। কিন্তু শিশিরকে বিদায় দিতে তার বুকের ভিতরটা ফেটে যাচ্ছিল। শিশির যাবার সময় বিন্দুর দুহাত ধরে বলে গেলো চিন্তা করো না, আমাদের জন্য দোয়া কর। আমরা যেন এ যুদ্ধে জয়ী হতে পারি। জয়ী হয়ে যদি বেঁেচ থাকি তাহলে স্বাধীন দেশে ফিরে আমরা আমাদের স্বপ্ন পূরণ করবো। স্বাধীন দেশে আমরা আমাদের গ্রামের সবুজ প্রকৃতিতে ঘুরে বেড়াবো, নৌকায় করে ঘুরে বেড়াবো আর গ্রামের স্কুলে ছোট ছোট বাচ্চাদের পড়াবো। বিন্দু তখন শিশিরের কথার কোনো উত্তরই দিল না। বিদায় কালে বিন্দুর দুচোখ থেকে দুফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। এ অশ্রুই শিশিরকে বুঝিয়ে দিলো যে বিন্দু তার ফেরার অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকবে।বিন্দুর কাছে থেকে বিদায় নিয়ে শিশির তার বন্ধুদের সাথে প্রশিক্ষণ নিয়ে মাতৃকার মুক্তির জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারা তুমুল ভাবে শত্রুর সঙ্গে মোকাবেলা করতে লাগলো। গ্রামের পর গ্রাম তারা শত্রুমুক্ত করতে লাগলো। এভাবে তারা প্রচন্ড গতিতে শত্রুদের গতি প্রতিহত করছে। তারা যেন জাতির অপরাজিত সৈনিক। যুদ্ধ শেষের পথে, অপরাশনটা ছিল ঢাকা ক্যান্টনমেন্টর পাশে। বিজয়ের ধ্বনি আস্তে আস্তে তাদের কানে ভেসে আসছে। তারা দূর্বার বেগে গুলি চালাচ্ছে। একে একে ধ্বংস করে দিচ্ছে সকল শত্রুদের । একসময়  একটা গুলি এসে লাগল শিশিরের বুকে। সে মাটির বুকে লুটিয়ে পড়ল। ঐসময়  তার দুজন বন্ধু তাকে নিয়ে এক বাড়িতে আশ্রয় নিল। সে বাড়ির গৃহ কর্তীর সাহায্যে তারা শিশিরের শরীর থেকে গুলি বের করার সিদ্ধান্ত নিল। কিন্তু  শিশিরের কথা তোমরা আমাকে নয় আমার দেশ মাতাকে বাঁচাও। তবেই যে আমাদের মুক্তি বন্ধুরা। শিশিরের কথায় তার বন্ধুরা তাকে ঐ অবস্থাতেই রেখে যুদ্ধ ক্ষেত্রে রওনা দিতে বাধ্য হলো। যুদ্ধ চলছে, যেন আকাশ থেকে একের পর এক বাজ পড়ছে। কায়েক ঘন্টার মধ্যে আহত শিশিরের শরীর থেকে যেন সমস্ত রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। ধীরে ধীরে সে নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। এমনি সময় তার কানে ভেসে আসছে। বিজয়ের জয়ধ্বনি। জয় বাংলা, বাংলার জয়। নিস্তেজ শিশির বাড়ির বাহিরে বেড়িয়ে মাটির বুকে শুয়ে পড়ল। দেশ মাতৃটাকে মুক্ত করার স্বপ্ন পূর্ণ হলো তার। তখনই তার মনে পড়ে গেল তার পরিবারের কথা। বিন্দুকে নিয়ে দেখা তার স্বপ্নের কথা। তার সে স্বপ্ন দেখতে দেখতে সে মৃত্যুর বুকে ঢলে পড়ল। এমনি হাজারো শিশিরের স্বপ্নের বিসর্জন ও হাজারো প্রিয়জনের অপেক্ষায় প্রতীয়তমান আমাদের এ স্বাধীনতা, আমাদের এ বিজয়। এ বিজয় আমাদের গর্ব আমাদের অহংকার।

No comments