বাদশা ও শহিদ মিনার
মাহিগঞ্জই ছিলো রংপুরের প্রাচীন ও আদী শহর। আশপাশের খোর্দ্দ রংপুর, ছোট রংপুর, বড় রংপুর গ্রামগুলোর সাথে জড়িয়ে আছে রংপুরের নাম।
এসব গ্রামের নামই মনে করিয়ে দেয় আদি রংপুরের হারানো অতীত। এসব এলাকার বিভিন্ন গ্রামের কৃষিজীবী, ব্যবসায়ী, পাইকার, হাওয়াইকারেরা কাজ শেষে দল বেঁধে আসে মাহিগঞ্জ বাজারে। কেউ জৈব সারে ফলানো দেশি ধান, পোলাও-কাউনের চাল, আলু,সরিষা, কেউ পাট,তামাক, সুপারী, কেউবা বিষমুক্ত গাছের পাকা আম-কাঁঠাল, জাম, ডালিম, পেয়ারা, লটকো, লিচু,নেওয়া আনে বাজারে। বাড়ির পোষা গুরু-ছাগলের খাঁটি দুধ, পুকুর-বিলের তাজা মাছ। ভিটার আদা,হলুদ মরিচ,রসুন,পিয়াজ,শাক-সবজিও। কেউ আবার মাজার-মসজিদে বড় জামাতে নামাজ আদায় করে। শীতলা-পরেশ নাথেও কেউ করে পূজা-আর্চনা। বাড়ি ফেরার আগে মনজা-শম্ভু,হরিসাধন-মধুর হুমাপ্যাথি,পাগলা ডাক্তারের মিকচার আর আফানউল্লাহ কবিরাজের গাছন্ত ঔষধ নেয় অসুখ-বিসুখে। ফরমান-কালুর মিষ্টির দোকানে আমিত্তি,বুট-বুন্দিয়া,চা-নাস্তা,গল্প-গুজব শেষে শাহালমের পানের দোকানে পান খায়। কেউ কেউ বিড়ি কেনে, আলোয়া-খইনি ডলে, রাস্তাহাটে,একসাথে দল বেঁধে। বিভিন্ন বয়সের বিভিন্ন পেশার মধ্যবিত্ত নি¤œবিত্ত -দরিদ্র কর্মজীবী মানুষের হাট-বাজারের এই দৃশ্য অতি চেনা।
প্রতিদিনের বাজার হাটের এই চলাচলে দেশ, চলমান রাজনীতির
হালচাল,কৃষি,যোগাযোগ,ভোট,হারজিত,উন্নতি-অবনতি নানা বিষয় জমে ওঠে গল্পে। আলাপে-আলোচনায় বাদ যায় না গ্রামীণ মানুষের ঘর-গেরস্তি, আবাদ-সুবাদ, খরা-বন্যা, ফসলহানি, বাজারদর, লাভ-লোকসান, চাকরি-ব্যবসা। বাদ পড়ে না অসুখ-বিসুখ বা ঝগড়া-ফ্যাসাদ, মামলা-মোকদ্দমা, সমাজ-জামাত, শালিস-বিচার কোন কিছুই। হারানো দিনের গ্রাম-সমাজের বুনিয়াদ,ঐতিহ্য-সভ্যতার সাতকাহন হয় রাতের মতো গভীর।
আফানউল্লা স্কুলের পাশেই মসজিদ সংলগ্ন মাজার। একটু পূবেই গার্লস স্কুল এর পাশ দিয়ে দখল,দুষণে মৃত প্রায় নদী ইছামতি। একসময় ছিলো ভরা যৌবনা। দুকূল ছাপিয়ে ছিলো স্রােতের ধারা। সর্পীল ফেনিল ঢেউয়ে ছিল উত্তাল। খরস্রােতা নদীতে ছিল পাথরবাঁধা ঘাট । দেশ-বিদেশের নৌকা আসতো। সারি সারি নৌকা ছিলো ঘাটে বাঁধা । পাল তুলে চলতো নৌকার মিছিল, নানা পণ্যের পসরায়। মাঝি-মাল্লার ভাওয়াইয়া-ভাটিয়ালীর সুরে মুখরিত ছিলো দিগন্ত বিস্তৃত।
সরব ছিলো নদীপথ, পাথরঘাটা ছিলো কর্মমুখর। নদী তীরে কাশবনে দোল খেত শরতে বাতাস। ধবল জলে জ্যোৎ¯œার লুকোচুরি,প্রতিচ্ছবি ভাসতো সুনীল আকাশের। গ্রীষ্ম-বর্ষায় দুরন্ত কিশোর-তরুণের উদোম সাঁতার, নদী পারাপারের চেনা কত না দৃশ্য। ছিলো যাযাবর বেদে-বেদেনির ভাসমান জীবন। সাপ খেলা,সিংঙ্গা লাগা,সাপের তেল,তাবিজ-কবজ নিয়ে ধোকা খেত গ্রামের সরল নারী-পুরুষ।খোর্দ্দ রংপুর গ্রামের আসমতের ছেলে মজিবর, গাছ-গাছড়া ঔষধ দিয়ে ভাংগা-মচকা ভালো করা কবিরাজ আব্দুল দেওয়ানীর ছেলে গ্রামের প্রবীণ তৈবুল মিয়া। সম্পর্কে মামা-ভাগ্না, দুজনের খুব মিল। ঘর-গেরস্তির কাজ শেষে প্রতিদিন হাট-বাজারে যায়, বাড়ি ফেরে একসাথে। কখনও সাথে থাকে মজিবরের জ্যাঠা কিসমতের ব্যাটা বক্কর, কাদের তৈবুলের ভাই মগবুলের ব্যাটা মহুবর,তার বউয়ের বড় ভাই জয়নালের ব্যাটা লুৎফর। বাজার যাওয়া-আসার মেঠো পথে চলে কতো গল্প। মজিবর বলে, ফরমান চাচার ব্যাটা বাদশা, মুই, বক্কর ভাই, কাদের, মহুবর, ইছামতি নদীতে কতো সাঁতার কাটচি, কলার ভুরাত ভাসি বেড়াইচি, কাগজের নৌকা বানেয়া ভাসে দিচি। ক্লাস আর পড়া ফাঁকি দেওয়ায় স্কুল ও লজিং মাস্টার খায়রুল স্যারের কত ডাং খাচি। নদীর তীরত ধান পাহারা দিবার সময় নাড়াবাড়িত কদুর ডুগি-আন্ডা আলুর ডাইল দিয়া ভাত খাচি। চেংরা চেংরি মিলি বাড়ি থাকি চুপকরি চাউল, কালাই, আলু টাপা থাকি হাঁস মুরুগি আনি নদীর ঘাটত কাশিয়াবাড়িত পিকনিক খাচি। স্কুল শেষে রাস্তাত মারবেল খেলাইচি, ভুইয়ত চেংগু-ডান্টি, দাড়িয়াবান্দা, ছি বুড়ি গোল্লাছুট খেলাইচি। বাদশার বইন, এনছানের বইন আবুল হাওয়াইকারের ব্যাটা-বেটি, ইলিয়াস মামার ছাওয়ারা কাশিয়াফুল, তারাফুল, গেন্দাফুল তুলি খোঁপাত দেচে তাক নিয়ো কতো হইচই।
পানখায় মুচকি হাসে আর মামা বলে-তার জন্যে তোর মাও ঝাকালিবুর কতো ডাং খাচিস! বাদশার মামা আবুল হাওয়াইকারের বেটির সাথে বাদশার খুব ভাব আচিল। ইস্কুল না যায়া নদীর পার দিয়া হাত ধরি কতো বেরাইচে, নুকানুকি খেলাইচে তাক নিয়া কতো কানডো।! আঙ্গুরের মার জাঙ্গির শোমাস, ঢাংগার গাচের জমবুরা, কাচামিটা আম নেচু, বাবলুর মার ইদি সুপরি, মোস্তপার মার কমরেঙ্গা, বাদশার মার নেচু, বাবলুর মার নটকো কতো সাবার কচ্চে; কাজর বাড়ির আমলি,তোফার বাপের আড়ার বেতগুয়া,রশিদের মার আমলক্কী,জুলহাসের মারজলপাই, শিয়ালুর বাড়ির ডাব, আজাদের মার বড়াই, কান্দরার বাড়ির পানিয়াল খায়া কান্দরির কতো কথা, কতো গাইল খাচি। গাইলের ভয়োত বাড়িত থাকপার পাইস নাই, কোনো কোনদিন অনেক খোঁজাখুঁজি করি মাইনষের বাড়িত থাকি ধরি আনছি কতো রাইতে মামা কয়; আর হাসে। মামা বলে, বাদশার সাহস যেমন আচলো, খচ্চরো আচলো তেমন। ছোট থাকাৎ ওরকম অনেক খচরামো কচ্চেলো, বাড়িত কাকো না কয়া কতো পালে বেড়াইচে। স্কুল ও খেলার সাথী বাদশার বদনাম সহ্য হয় না মজিবরের। বলে - চেংরা বয়সে এর চ্যায়া আরও কতো কি মানুষ করে? খালি বাদশা আর মোর দোষ। মামার বিরক্ত বুঝতে পেরে অন্য প্রসঙ্গে কথা তোলে মজিবর, বলে- মামা আগে তা ইছামতি নদীর পাথর ঘাটের নামের জন্যেনাম হচিল পাথরঘাটা।
তার নাম এ্যলা মাহিগঞ্জ হইল ক্যানে? সউগ জানিস, বুজিস এ্যটা ফির জানিস না? -মামা কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলে, তোমার স্কুলের পাচ দিয়ে যে ইছামতি নদী, ঐ নদী দিয়া মাছের পিটোত চড়ি এক বুজুর্গ আচ্চিলো বুখারা শহর থাকি ইসলাম প্রচারে, তার নাম জানিস? স্কুলর পাশত মসিজিদের ভেতরোত তার মাজার আছে, কবার পাইস? মামার কাথায় সায় দেয় ভাগ্না, বলে জানো। তার নাম শাহজালালুদ্দিন জাহাগাশত বোখারী। তার নামে মাহিগঞ্জ হইচে, মামার জবাবে সন্তোষ্ট হয় না ভাগ্না, হয় না সাথে চলা অন্যরা,বক্কও সহ সবায় জানতে চায়-পীরের নাম যদি শাহাজালাল হয়,তাইলে শাহজালালগঞ্জ হইবে-মাহিগঞ্জ ক্যানে? আর বোখারা শহর তো অনেক দূর, মাছটা ফির কতো বড় তার পিটত চড়ি এতদুর আইসা যায়? মামা ক্ষিপ্ত হয়ে বলে-বক্কর আর মহুবর তো স্কুল ফাঁকি দিয়া খালি টিকটিক খ্যালে ব্যারাইচে, ওমরা কি জানে? অনেক দিন আগের কথা-তখন নদীত ¯্রােত আচলো। নদী ওসার আচলো অনেক, সেই নদীত মাচের মতো নৌকাত চড়ি আচ্চেলো ঐ পীর, তাক মাহিসওয়ার কয়? তাক শুনচিনো আফানউল্লার নাতী তালেব মৌলবির কাচোত। মাহিসওয়ার হওয়ায় মাহিগঞ্জ হইচে? সেটা না হয় বোজনো তা খোর্দ্দ রংপুর হামার গ্রামটা ফির হাওয়াইকার টারি হইল ক্যানে? সবাই মামার কাচোৎ জাইনবার চায়-মামা মাথা চুলকায় আর কয়-ঐযে বাদশার কথা আর আবুল হাওয়াইকারের কতা কনু, আঙ্গুরের কতা কইনেন সেটে ঐ নামের রহস্য? রহস্যটাও জানতে চায় ভাগ্না সহ সবাই, বলে-রহস্যটা একনা কন মামা শুনি, এ্যগলাতো জানা খায়, মামা বলে-মাহিগঞ্জ বাজার ডাকিনিচলো বাসতউল্লা। উয়ার বাপ দাদারা এই বাজারের ইজারাদার আচলো। বাজার ডাকি তোলা তোলচেলো। খুব প্রভাবশালী আচলো। বাসতউল্লার বওনাই বারেক হাজীর বাড়ি হামার খোর্দ্দ রংপুরত। য্যাটে বাদশার বাপ ফরমানে বাড়ি। হাজির ছাওয়া পোয়া আচলো না। বসতউল্লার ব্যাটা ফরমান উয়ার ভাগ্না, তাক বিয়াও দেয় বারামউল্লার বেটি সিদ্দিকাক দিয়া। গোরা ভুলভুলা ছাওয়া, দেখতে খুব সুন্দর। লেখাপড়া কম করলেও নামাজ-কোরআন জানচেলো, খুব পরহেজগার আচলো। পরহেজগার হওয়ায় আচলো। পরহেজগার হওয়ায় হাজি ভাগ্নাক বউ সহ বাড়িত আনি থোচলো। বারামউল্লারা হাওয়াইকার আচলো। আতশবাজি, ফটকা, গটিয়া বন্দুক, মেলা রকমের হাওয়াই-বাজি, রং-তামাশার ব্যবসা আচলো। রোজাত এপতার,পাচা রাইতে সেহেরি, ইদের জামাত, বিয়াও, মহরম, আকড়া, মেলা-বান্যি, পূজা সউগ অনুষ্ঠানত বন্দুক ফটকা আতশবাজির খুব চল আচলো। এ্যলকার মতো মাইক, গান বাজনা আচলো না। রোজার ইদের নামাজের আগত দমকলের সাইরেনও আচলো না। কারেন্টের মরিচ বাতি, আতশবাজিও আচলো না। তখন হাওয়াইকারের উপর আচলো অনন্দ ফুত্তি আর তামাশার সউগ ভস্যা। নাম ডাকও আচলো হওয়াইকারের। ব্যবসাও হচরো ভালো। মেলা জাগা থাকি হাওয়াইকারের বাড়িত খরিদ্দারেরা আচ্চেলো। হাওয়াইকারের নাম বারায় হামার গ্রামের নাম বদলি যায়। হয় হাওয়াইকারটারি। তখন এই রকম অনেক গ্রামের নাম বদলি গেইচে। নাম হইচে সর্দ্দারটারি, মুন্সিটারি, কাজিটারি।চা মিষ্টির দোকানে শুধু কৃষিজীবীই নয়, গ্রামের রাজনীতির দেওয়ানি, দরবারি, সর্দ্দার, কাজি, মুন্সি, হাওয়াইকার, মাতাব্বর, নেতা-পাতিনেতারাও বসে।
বসে এলাকার নাম ডাক আলা ভালো মন্দ সব মানুষ। চায়ের সাথে চলে খোশ গল্পো। ফরমানের দোকানে তার তিন ছেলেই খরিদ্দর চাহিদা মেটায়। কোনো দিন খরিদ্দার কিছুটা কম থাকলে নিজ গ্রামের পরিচিত মানুষদের সাথে তারাও যোগ দেয় গল্পে। সেকেন্দার তৈবুল মিয়াকে বলে, চাচা শুক্রবার বাদ জুম্মা মসজিদে মা’র জন্য খতম ও দোয়া হইবে, থাকেন গ্রামের সাবাইকে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে? তৈবুল জানতে চায়, তোর মা’র অবস্থা ক্যামোন? খুব খারাপ, সেকেন্দার উক্তর দেয়-বলে কি হয়, জানি না। ছোট ভাই সামচুল বলে, বিছানাত কতো বছর, সুকি পাত নাগচে, রেজা বলে-মরার মতো বিছানাত পড়ি আচে, এতো কষ্টের চ্যায়া তওবা আর খত পাড়াইলে যদি কিচু হয়। সেকেন্দার বলে-মুন্সির কথায়, আল্লা যদি মাফ করে ভালো হবার পায়, নাহলে কষ্ট থেকে বাঁচবে। তৈবুল মিয়া বলে, রেজার বউয়ে তো খেজমত করে, তার জন্যে তো বুড়ি এলাও উপরোত আচে। নাইলে এতোদিন থাকে। বাদশা মুক্তিযুদ্ধে যায়া ফিরি না আসিল তখোন থাকিতো তোর মাও বিছানাত পড়িল, আর ভালো হইল না । সেকেন্দার বলে এজন্য চাচা, আমিই বেশি দায়ি।
মজিবর বলে-দোষের কী? বয়স হইলে মানুষ মরবে, সেটাতো অস্বভাবিক নোওয়ায়। মজিবরের কথায় তৈবুল মিয়া বলে, হায়াত মউত সউগ আল্লাহর হাতত-মাইনসের কিচু করার আচে? তৈবুল মিয়ার কথার উত্তরে-সামছুল বলে, বাদশা ভাই যুদ্ধে গেলো, ফিরি আসিল না, সেই চিন্তায় বাবা গেল, মা বিছনাত পড়িল, হামার সংসার এলামেলো হয়া গেইল, সেই শোকে দুই বইনো মরিল, আর মার মরার দশা; রেজা বলে, ঢাকাত তখন বড় ভাইজান ইপিআর বাহিনীত চাকরি করে, বাদশা হটাৎ উয়ার বন্দুর ঘরে সাতে আসি মাক কইল মুই ঢাকা যাও মা, বড় ভাইজানের সাথে দেকা করবার।মা মনে কচ্চে, সামনোত পরীক্কা হয়তো কোনো দরকার, সেইজন্যে বাদা করে নাই, খালি কইচে, দেকি শুনি যাইস,রাস্তা ঘাটত ফির বিপদ না হয়। বাদশা মাক কচলো, ভাইজানের সাথে দেকা করি একদিন পরেই আসিম মা, চিন্তা করিস না, তাড়াতাড়ি আসিম। যুদ্ধে যাওয়ার কথা মোকো কচলো বাদশাহ, পরীক্ষার জন্যে মতিন ভাইজান মোক যাবার দেয় নাই-মজিবর বলে। সেকেন্দার বলে, বাদশা যুদ্ধে যায়া ফিরে আসবে না জানলে-যুদ্ধে যাওয়ার পারমিশন দিতাম না। আমি তখন ঢাকার পিলখানায় ইপিআর সদর দপ্তরে, ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ সকালে আমার সাথে দেখা করে বাদশা। ভাবলাম সামনে মেট্রিক পরীক্ষা টাকা পয়সার দরকার সেজন্য হয়তো এসেছে। খাওয়া -বিশ্রাম শেষে জিজ্ঞেস করি হঠাৎ ঢাকা কেন? বাদশা মাথা নিচু করে বললো-ভাই আমি বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনতে এসেছি, তুমি আমাকে রেসকোর্স মাঠে নিয়ে যাও। দেশে গন্ডগোল লাগবে, বঙ্গবন্ধু ভাষণ দেয়-তা শুনতে রংপুর থেকে অনেক ছাত্র নেতারা এসেছে। তখন বুষলাম ছোট ভাই লেখাপড়া ছেড়ে রাজনীতিতে জড়িয়েছে। দু’ভাই রেসকোর্স মাঠে যাই। মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ। বঙ্গবন্ধু মাঠে আসার আগেই মাঠ লোকে লোকারণ্য, লাখো জনতা অধীর অপেক্ষায়, শ্লোগানে শ্লোগানে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হচ্ছে-ধ্বনিত হচ্ছে ‘‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা’’।বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু মঞ্চে আসলেন লাখো জনতার করতালিতে মুখরিত রেসকোর্স। ১৯ মিনিটের কম ভাষণ দিলেন বঙ্গবন্ধু।
বজ্রকন্ঠে দিলেন স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষনা-‘‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’’। লাখো তরুণ-যুবক-জনতার মতো সাহসী বাদশার রক্তেও প্রবাহিত হয় স্বাধিনতা সংগ্রামের ফলগুধারা। বড় ভাইকে অনুনয় করে চায় যুদ্ধে যাবার অনুমতি বলে -ভাই আমি যুদ্ধে যাবো, তুমি আমাকে বাধা দিয়োনা। এসব কথা শুনে দোকানে বসে থাকা সাবাই নিশ্চুপ প্রায়।
সামছুল বলে ওঠে-‘‘তখন বাদা দেলে বাদশা যুদ্ধে যাবার পারিল না হয়, হামার বাড়িত এমন শোকের ছায়া পড়িল না হয়” । চোখ মুছতে মুছতে রেজা বলে-“মরার আগোত বোধায় বাদশার সাথে আর দেখা হবার ন্যায় রে রেজা-মা সে কতা কয় আর কান্দে”। সামছুল বলে-স্বাধীনের দুই মাস আগে একবার বাড়ি আসিল, হামরা তখন দোকান যাবার ব্যাড়াচি-ঘারত অস্ত্র, হাতোত ব্যাগ, তাতে বোমা; দাড়ি-চুল বড় বড় দেকি চেনায় যায় নাই। পরে মার পাত ছালাম করি কয়-“মা মুই বাদশা”। মা অবাক হয়া, কোলত জড়ে ধরিয়া হুক হুক করি কান্দে। কইল বাজার থাকি আন্ডা আলা ইলিশ মাচ আইনবার। তাড়াতাড়ি মুই দোকান যায়া আব্বার কাচে টাকা নিয়া বাড়ি আসনু, দ্যাকো মা দরপা থাকি মুরগি ধচ্চে,গচি মাচ আন্ধচে, সেদলের ভত্তা, নাপা শাগের ঝোল কচ্চে। তাড়াগাড়ি ইলিশ মাচ আন্ধিয়া মাতাত হাকায় আর ভাত তোলে খিলায়। বেশি দেরি করে নাই বাড়ির বগলোত গোসাইবাড়ি, স্যাটে ইপিআর ক্যাম্প,জানবার পাইলে গুলি করি মারবে, আর হামার বাড়ি ঘড় পুরি দেবে, সেই ভয়ে তাড়াতাড়ি চলি গেইচে। রাইতোত যাওয়ার সময় মাতাত হাত দিয়া দোয়া করে আর মা কয় দ্যাশ স্বাধীন করি ফিরিস বাবা। কিন্তু দ্যাশ স্বাধীন হইল, কত মুক্তি ফৌজ ফিরি আসিল, বাদশা আসিল না। মহিন্দ্রার মোস্তফা, মাহিগঞ্জের তোফা মিলিটারি, সুলতান, সাজু চদরি, জলিল সবায় আসিল, সবায় আসি বাদশার খোঁজ ন্যায়, তামার খোঁজ করা দ্যাখি মা বাবা সহ গ্রামবাসি সবার সন্দেহ হয়-বাদশা বুজি নাই। তোফা মিলিটারি হামার বওনাই, তার ফিরি আসি বাবাক কইচে-৬ নম্বর সেক্টরে এক সাথে যুদ্দ কাচ্চেলো। দুলাভাই মোক কইচে, প্রথমেতো তিস্থা ব্রিজোৎ ক্যাপ্টেন নওয়াজেসের সাথে যুদ্দ কচ্চেলো তিস্থার যুদ্দতোৎ গুলি খায়া আহত হচলো, মহিন্দ্রার এক মুক্তি ফৌজ খবর দেচলো, মুই উয়াক দেকপ্যার ইন্ডিয়ার হাসপাতালোত গেচনু। মজিবর আফসোস করি কয়-বাদশা সেকেন্দার ভাইর অটে ঢাকা থাকি ফিরি মোকো যুদ্দ যাবার কচলো, পরীক্ষা দেকি ভাইজান মোক যাবার দেয় নাই। বাদশার এসব কথা শুনে হতভম্ব হয় দোকানের সকলে। তৈবুল মিয়া বলে-কোটে মরিল, ক্যামন করি মরিল, জানাযা দাফন হইল কিনা তাও বুঝি জানা যায় নাই! রেজা কয় তোফা দুলাভাই জাহেদা বুক কচলো,৬ নম্বর সেক্টর আচলো নদীর সীমানায়। তিস্তা নদীর পাটগ্রাম না থেতরাইত একবার পাকবাহিরীর সাথে যুদ্দ কচ্চেলো বাদশা। পানা মাতাত দিয়া নদী সাতরেয়া খান সেনাক বোমা মাচ্চেলো, টের প্যায়া পাকবহিনী খই ফোটার মতো গুলি ছোচ্চেলো। তাতে বোধায় মারা যাবার পারে-একই কতা জায়েদা বু কচলো। সেকেন্দার বলে, একাত্তুরের যুদ্দের সময় ঢাকার পিলখনায় বন্দি থাকায় বাড়ির আর বাদশা করো খোঁজ নিতে পারেনি। শুধু বাদশাই নয় ত্রিশলাখ শহিদের রক্তে স্বাধীন আমাদেঠ দেশ। সামছুল বলে - বাদশা ভাই ছাড়াও যুদ্দের সময় খান সেনারা মাহিগঞ্জের শিবেন মাখার্জী,
খাম্বাখান, গনেশইপিয়ার, দ্বিজেন ঘোষ, উপেন পানাতি আরও কতো নারী পুরুষক গুলি করি মাচচে। নব্দীগঞ্জোৎ, শসানোৎ কতো ইপিয়ার, নেতাক গুলি করি মাচচে। হামরা শহিদ পরিবারের সন্তান এটা হামার বড় গর্ব। গর্বের সাথে বলে রেজা। বলে-১৬ ডেসেম্বর,২৬শে মার্চ অমপুুরের ম্যালা শহিদ পরিবার স্টেডিয়াম যায়, টাইন হল যায়। স্যাটে সবাক ফুল দ্যায়, সম্মান করে, উপহার দ্যায়, সমর্ব্ধনাও দ্যায় এ্যাটা কি কম পাওয়া। আগে ভালো থাকতে মা গেচলো, মা’র সাথে মুইয়ো গেচনু, মা বিচনাৎ পড়ি থাকায় মুই এ্যালা যাও, মুই বাদশা ভাইর ভাতাও তোলো-রেজা অনেকটা গর্ব করে বলে। তবে মা’র খুব দুক্কো আচলো-সেকেন্দার ভাই য্যামন অল্প লেখাপড়া করি ইপিঅরোৎ গেচলো, বাদশা ভাইক আইয়ে বিয়ে পড়েয়া সেনাবাহিনীর অপিসার হবার কচেলো। অয় অপিসার হইল হয় আর ভাইয়ের বেটি সালমাক দিয়া বিয়্যাও দেলে হয়। মা’র খুব আশা আচলো-সালমাক খুব পচন্দ করচেলো মা’ও। মা’র খুব ভালোবাচ্চেলো। মা’র মতো সালমাও এ্যালাও বাদশার অপেক্ষায়, বাদশা বোদায় একদিন আসপে! অয় মোক কচলো, স্কুল পড়ার সময় ইছামতি নদীর রতবাড়ি পুলের কাচোৎ একটা বকুল গাচ আচলো। সেই বকুল ফুলের মালা তুলি দুই জনে দুই জনোক মালা বদল কচ্চেলো। সেই স্মৃতি বুকে নিয়ে পথ চেয়ে আজও চেঁয়ে আছে সালমা।
বাদশার জন্য গর্ব বাদশার মা’র, ভাই বোনের, পরিবারের। এই গর্বে গর্বিত মাহিগঞ্জ, খোর্দ্দ রংপুর, গাওয়াইকারটারি গ্রাম। ফতেপুর রোডের চৌমাথায় রংপুর-পীরগাছা সরকের পাশে গড়ে উঠেছে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইছামতির তীরে আফানাউল্লাহ স্কুলের মাঠে শহিদ মিনার। হাজারো শহিদের আত্বার প্রতি বিন¤্র শ্রদ্ধায় ফুলে ফুলে ভরে ওঠে স্মৃতির মিনার।
বাদশার মতো শত শহিদের আত্বোৎসর্গে গর্বিত স্বদেশ, শহিদ পরিবার-সমুচ্চরে সম্মিলিত উচ্চারণ সবার।পূবে খোর্দ্দরংপুর,ছোট রংপুর, বড় রংপুর গ্রামের উপরে উঠেছে রক্তলাল সূর্য। প্রভাত ফেরিতে আফানউল্লাহ স্কুলে এগিয়ে আসছে শিক্ষার্থীর ঢল। বাসা-বাড়ি দোকান খামারে উড়ছে সবুজের বুকে লাল পতাকা। মাহিগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারেও জনতার ঢল। ফুলে ফুলে ভরে যায় শহিদ মিনারের বেদি। তখনো দুরে ভেসে আসে গানের সুর-“এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা আমরা তোমাদের ভুলবো না”।
[বি:দ্র: কিশোরদের মুক্তযুদ্বের গল্প বইয়ে পূর্বে প্রকাশিত]
Post a Comment